সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলা স্বাস্থ্য বাণিজ্য বিনোদন চাকরি ভিডিও অডিও

আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে যুদ্ধ

ভাবুন, আমেরিকার মতো একটি গ্লোবাল সুপারপাওয়ার, যাদের শুধুমাত্র মিডল ইস্টেই ৩০ থেকে ৪০টি মিলিটারি বেস আছে, আর সেখানে মোতায়েন আছে প্রায় ৪০ হাজার সৈন্য. . . তারা যদি হঠাৎ করে আক্রমণ করার অনুমতিই না পায়?

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। জিওপলিটিক্সের ময়দানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কাতার বা সৌদি আরবের মতো মিত্র দেশগুলো যদি হঠাৎ পলিটিক্যাল চাপের কারণে আমেরিকাকে বলে দেয়, আমাদের মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা চালানো যাবে না, তখন কী হবে? আমেরিকার এত বিশাল আয়োজন কি মুহূর্তেই জিরো হয়ে যাবে?

সবাই ভাবে আমেরিকার কাছে সবকিছুর কন্ট্রোল আছে, তারা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে গেম পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই গেম এতটা সোজা নয়। তাদের 'প্ল্যান এ' অর্থাৎ, লোকাল বেস থেকে আক্রমণ করার সুযোগ যদি ফেইল করে, তাদের বাধ্য হয়ে শিফট করতে হবে 'প্ল্যান বি'-তে। আর এই প্ল্যান বি বা সেকেন্ড স্ট্র্যাটেজি হলো এমন এক জ্যামিতিক ফাঁদ, যা শুধু মিডল ইস্ট নয়, পুরো পৃথিবীর মানচিত্র এবং অর্থনীতিকে এক ধাক্কায় পাল্টে দিতে পারে।

তাহলে আসল লজিকটা কী? এই নতুন মাস্টারপ্ল্যান কীভাবে কাজ করবে? চলুন দেখা যাক।

এখন আপনি ভাবতে পারেন, ভাই, আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে যুদ্ধ হলে আমার কী? আমি তো বাংলাদেশে বসে আছি, আমার নিজের লাইফেরই হাজারটা প্যারা।

এখানেই আপনি সবচেয়ে বড় ভুলটা করছেন। কারণ এই যুদ্ধ শুধু মিসাইল, ড্রোন আর ফাইটার জেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সরাসরি আঘাত আসবে আপনার পকেটে।

পারস্য উপসাগরের হরমোজ প্রণালী হলো পৃথিবীর তেলের সবচেয়ে বড় চেকপয়েন্ট। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের বিশাল একটা অংশ এই রুট দিয়ে পার হয়। ইরান যদি এই রাস্তায় একটা ব্লক তৈরি করে বা মাইন বসিয়ে দেয়, তবে সারা বিশ্বে তেলের দাম রাতারাতি আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে। এর ইমপ্যাক্ট হবে হিউজ!

তেলের দাম বাড়লে ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট বাড়বে, আর ট্রান্সপোর্ট কস্ট বাড়লে আপনার প্রতিদিনের বাজারের চাল, ডাল, সবজি থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স, সবকিছুর দাম ডাবল হয়ে যাবে। আপনি টেরও পাবেন না কীভাবে হাজার মাইল দূরের একটা পলিটিক্যাল মুভ আপনার মাসের বাজেটকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সবাই মনে করে যুদ্ধ মানে শুধু মিলিটারির ব্যাপার, কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটা গ্লোবাল ইকোনমির একটা বিশাল রি-সেট বাটন। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে এই যুদ্ধের ফান্ডিং হয়।

এই পুরো মেকানিজম বা গেমটা বুঝতে হলে আমাদের দাবার বোর্ডের দিকে খুব সাবধানে তাকাতে হবে। আমেরিকা যদি মিডল ইস্টের বেসগুলো ব্যবহার করতে না পারে, তবে তাদের একটি বিশাল লজিস্টিক্যাল শিফট করতে হবে। তারা ব্যবহার করবে তাদের European Loophole।

অর্থাৎ আমেরিকাকে তখন সাইপ্রাস, গ্রিস বা বুলগেরিয়ার বেস থেকে অ্যাটাক লঞ্চ করতে হবে। কিন্তু F-35 বা F-16 এর মতো ফাইটার জেটগুলোর এত হাজার মাইল লম্বা পথ পাড়ি দেওয়ার মতো ইন্টার্নাল ফুয়েল ক্যাপাসিটি থাকে না। এখানেই গেমে এন্ট্রি নেয় KC-135 Stratotanker। এগুলো হলো আকাশের বুকে উড়ন্ত তেলের পাম্প। মাঝ আকাশে ফাইটার জেটগুলোকে তারা ফুয়েল সাপ্লাই দেবে। এই ট্যাংকার গুলো ছাড়া আমেরিকার এই মিশন এক পা-ও এগোতে পারবে না।

এরপর লোকাল ল্যান্ড বেসের অভাব পূরণে আমেরিকার নেভি তাদের ভাসমান শহরগুলোকে ময়দানে নামাবে। Gerald R. Ford ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে ভূমধ্যসাগরের দিকে নিয়ে আসা হবে। এই ক্যারিয়ারটি প্রতি মিনিটে চারটি জেট লঞ্চ করতে পারে! পুরোনো স্টিম ক্যাটাপোল্টের বদলে তারা ব্যবহার করবে অত্যাধুনিক Electromagnetic Aircraft Launch System। এই ম্যাগনেটিক ফিল্ড প্রযুক্তি জেটগুলোকে একদম স্মুথলি এবং অবিশ্বাস্য স্পিডে আকাশে ছুঁড়ে মারবে, যা এয়ারক্রাফটের ওপর চাপ কমায় এবং এফিশিয়েন্সি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আবার আমেরিকা তাদের আধুনিক ও দামি PAC-3 প্যাট্রিয়ট মিসাইলগুলো বাঁচিয়ে রাখবে বড় কোনো ব্যালিস্টিক থ্রেটের জন্য। আর ইরানের সস্তা কিন্তু ভয়ংকর Shahid সুইসাইড ড্রোনের বন্যা ঠেকাতে তারা জার্মানি এবং জাপান থেকে পুরোনো আমলের প্যাট্রিয়ট মিসাইল নিয়ে আসবে। হ্যাঁ, আধুনিক যুদ্ধের এই লজিক বেশ অদ্ভুত, সস্তা অস্ত্রের মোকাবিলা সস্তা অস্ত্র দিয়েই করতে হয়, নাহলে আপনি ইকোনমিক্যালি দেউলিয়া হয়ে যাবেন।

আর আক্রমণের শুরুতে কোনো পাইলট যাবে না।

নেভির ডেস্ট্রয়ারগুলো থেকে ছোঁড়া হবে শত শত Tomahawk ক্রুজ মিসাইল। এগুলো Nap of the earth স্টাইলে অর্থাৎ মাটির একদম কাছাকাছি দিয়ে উড়ে যাবে, যাতে ইরানের রাডারে ধরা না পড়ে। তাদের প্রথম টার্গেট হবে ইরানের চোখ ও কান অন্ধ করে দেওয়া, অর্থাৎ S-300 এবং S-400 রাডার সিস্টেমগুলোকে ধ্বংস করা।

কিন্তু ভাববেন না ইরান চুপ করে বসে থাকবে। তারা আমেরিকার এই বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে লড়বে অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার  দিয়ে। তাদের ট্যাকটিক্সগুলো হলো নিখুঁত এবং মারাত্মক।

যেমন আমেরিকার বড় জাহাজগুলোর সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ করার বোকামি ইরান করবে না। তারা একসাথে শত শত ছোট এবং দ্রুতগতির স্পিডবোট নামিয়ে দেবে, যেগুলো রকেট এবং মেশিনগান দিয়ে সজ্জিত থাকবে। এতগুলো টার্গেট একসাথে আসলে আমেরিকার জাহাজের ডিফেন্স সিস্টেম কনফিউজড হয়ে যাবে।

আবার ইরান এই প্রণালীতে স্মার্ট মাইন বিছিয়ে দেবে, যা নির্দিষ্ট জাহাজের অ্যাকোস্টিক সিগনেচার শুনে ব্লাস্ট করবে। এটা শুধু নেভিকে আটকাবে না, গ্লোবাল ইকোনমিতে একটা বিশাল ধাক্কা দেবে।

এছাড়া ইরানের পাহাড়ি উপকূলীয় এলাকায় তারা মোবাইল মিসাইল লঞ্চার ব্যবহার করবে। Shoot and scoot ট্যাকটিক্স, অর্থাৎ মিসাইল মেরেই তারা জায়গা বদলে ফেলবে।

আর পারস্য উপসাগরের অগভীর পানিতে আমেরিকার বড় নিউক্লিয়ার সাবমেরিন গুলো অচল। কিন্তু ইরানের ছোট ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন গুলো সমুদ্রের তলদেশে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে। আমেরিকার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের নিচ দিয়ে গিয়ে তারা টর্পেডো হামলা করবে, যা ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব।

সবশেষে তারা হাজার হাজার সুইসাইড ড্রোন পাঠাবে আমেরিকার জাহাজের রাডার ডিশ ধ্বংস করার জন্য।

অবশ্যই আমেরিকার হাতেও ট্রাম্প কার্ড আছে, Air Force Global Strike Command। তারা B-2 Spirit স্টিলথ বোম্বার দিয়ে ইরানের মাটির ভেতরের বাঙ্কারগুলো ধ্বংস করতে পারে। B-1B Lancer সুপারসনিক বোম্বার দিয়ে নিচ দিয়ে উড়ে এসে মিসাইল বৃষ্টি নামাতে পারে এবং B-52 Stratofortress দিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে আক্রমণ চালাতে পারে।

তবে লাফ দেওয়ার আগে সাবধান. . .

অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের জিওপলিটিক্যাল অ্যানালাইসিস এবং মিলিটারি ট্যাকটিক্স দেখে খুব এক্সাইটেড হয়ে যান। মনে করেন এটা যেন Call of Duty বা কোনো ভিডিও গেম চলছে। পপকর্ন হাতে নিয়ে আমরা ভাবি, কে কাকে কতগুলো মিসাইল মারলো। কিন্তু রিয়েলিটি অনেক বেশি ডার্ক, অনেক বেশি নিষ্ঠুর।

এই ধরনের কোনো যুদ্ধে আসলে কেউ জেতে না।

আমেরিকা হয়তো তাদের সর্বাধুনিক টেকনোলজি দিয়ে ইরানের বড় বড় স্থাপনা ধ্বংস করে দেবে, কিন্তু এর বিনিময়ে ইরান মিডল ইস্টের আমেরিকান বেসগুলোতে যে ব্যালিস্টিক মিসাইল বৃষ্টি নামাবে, তা পুরো রিজিয়নকে একটা জ্বলন্ত নরকে পরিণত করবে। আমেরিকার সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়তে পারে।

আর গ্লোবাল ইকোনমিতে এমন এক ধ্বস নামবে, যা রিকভার করতে দশকের পর দশক সময় লাগবে। স্টক মার্কেট ক্র্যাশ করবে, চাকরি হারাবে লাখ লাখ মানুষ, মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশন এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে আপনার জমানো টাকার কোনো ভ্যালু থাকবে না।

এই সুপারপাওয়ারদের ইগোর লড়াইয়ে, এই জিওপলিটিক্যাল দাবার বোর্ডে সবসময় বলির পাঁঠা হবো আমরা, সাধারণ মানুষ। এই ভয়াবহ ফাঁদ থেকে বাঁচার কোনো শর্টকাট নেই।

তাহলে দিনশেষে আমরা কী শিখলাম এই মেকানিজম থেকে?

ক্ষমতা বা পাওয়ার কখনোই সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ নয়। আপনি যতই শক্তিশালী হোন না কেন, প্রকৃতির বা জিওপলিটিক্সের একটা ছোট পরিবর্তন আপনার পুরো সিস্টেমকে কলাপ্স করে দিতে পারে। আমেরিকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে যে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বা রাডার বানিয়েছে, ইরান হয়তো মাত্র কয়েক হাজার ডলারের সস্তা ড্রোন আর মাইন দিয়ে সেই টেকনোলজিকে চ্যালেঞ্জ করে বসবে।

এটাই হলো পাওয়ার এবং ইকোনমির সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স।

দুর্বলতা অনেক সময় সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে, যদি আপনি জানেন কীভাবে সঠিক সময়ে সঠিক গেমটা খেলতে হয়। বড় বড় দেশের পলিসি মেকাররা এই খেলাটা খুব ভালো করেই বোঝে, শুধু মাঝখান থেকে ইমোশনাল হয়ে যায় সাধারণ জনগণ।

মনে রাখবেন, সিস্টেমে সবসময় লুপহোল থাকে। আপনাকে শুধু চোখ-কান খোলা রাখতে হবে এবং বুঝতে হবে আসল সুতোটা কে নাড়ছে।

সর্বশেষ

1

হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দর থেকে কি জাহাজ চলছে

2

আমাদের সময়ের হিটলার

3

ইসরাইলের চেয়ে ইরানকে বড় শত্রু মনে করে?

4

যেভাবে ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প

5

ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলটকে খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

6

স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল

7

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কতটা বাস্তব

8

সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট, জুলাই সনদ

9

Al Jazeera English | Live

10

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

11

ধর্ষণ মামলা ও নারী নির্যাতন মোকাবিলায় সরকারের বিশেষ উদ্যোগ

12

রাজধানীতে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টি, ঈদের দিনও চলতে পারে

13

সরকার পুরোনো পথে হাঁটছে: নাহিদ ইসলাম

14

হরমুজ প্রণালী ট্রাম্পের মুখে চিন্তার ভাজ:-

15

কাল পবিত্র শবেকদর

16

আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায়

17

কারবারিদের আস্তানায় মিলল সাড়ে ১১ কোটি টাকার ইয়াবা

18

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পুতিনের অভিনন্দন

19

চার পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

20

শহীদ হাদি হত্যার আসামিদের দেশে

আমাদের ঠিকানাঃ

Sonartori Tower, 12 Sonargaon Road, Banglamotor, Dhaka 1000, Bangladesh.
ফোন : অফিস যোগাযোগ, +88 01730-372-370 ।
ফ্যাক্স : , । ই-মেইল: mail@lexbd24.com
বিজ্ঞাপন বিভাগ: ফোন: +88 01730-372-370, +88 01730-372-370 । ই-মেইল: mail@lexbd24.com
সার্কুলেশন : ফোন: +88 01730-372-370।

| নিউজলেটার

লেক্স বিডি ২৪ থেকে প্রতিদিন মেইলে আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।