যেভাবে ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প
১১ই ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার ঠিক আগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বহনকারী কালো এসইউভি হোয়াইট হাউসে এসে পৌঁছায়। নেতানিয়াহু কয়েক মাস ধরে ইরানে একটি বড় ধরনের হামলায় রাজি হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দিয়ে আসছিলেন। তাকে সাংবাদিকদের দৃষ্টির আড়ালে প্রায় অনাড়ম্বরভাবে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। নেতানিয়াহুর এই সফরটি ছিল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রথমে ওভাল অফিসের সংলগ্ন ক্যাবিনেট রুমে সমবেত হন। এরপর নেতানিয়াহু মূল অনুষ্ঠানের জন্য নিচে সিচুয়েশন রুমে যান, যে রুমটি সাধারণত কোনো বিদেশী নেতার সাথে সরাসরি বৈঠকের জন্য ব্যবহার করা হয় না।
নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার টিমের সামনে ইরানের উপর একটি অত্যন্ত গোপনীয় প্রেজেন্টেশন দেওয়া।
ট্রাম্প কনফারেন্স টেবিলের চিরাচরিত জায়গার পরিবর্তে
দেয়াল বরাবর লাগানো বড় স্ক্রিনগুলোর দিকে মুখ করে।নেতানিয়াহু বসলেন অন্য পাশে, ট্রাম্পের ঠিক বিপরীতে।
নেতানিয়াহুর পেছনে পর্দায় উপস্থিত ছিলেন মোসাদের পরিচালক ডেভিড বারনিয়া এবং ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা। নেতানিয়াহুর পেছনে দৃশ্যত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তারা এমন এক যুদ্ধকালীন নেতার চিত্র তৈরি করেছিলেন, যিনি তার দলবল দ্বারা পরিবেষ্টিত।
সেদিনের বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন হোয়াইট হাউসের চিফ অফ স্টাফ সুসি ওয়াইলস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় বৈঠকটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট রাখা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না। ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি আজারবাইজানে ছিলেন এবং বৈঠকটি এত অল্প সময়ের নোটিশে নির্ধারিত হয়েছিল যে তিনি সময়মতো ফিরতে পারেননি।
পরবর্তী এক ঘণ্টায় নেতানিয়াহু যে প্রেজেন্টেশন দেন, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একটি বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের পথে চালিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এবং এই বৈঠকের পর পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে ধারাবাহিক আলোচনা হয়, যার বিস্তারিত বিবরণ আগে প্রকাশ করা হয়নি। সেই আলোচনাগুলোতে ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেওয়া অনুমোদন করার আগে তার বিকল্প এবং ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করেছিলেন।
১১ই ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু জোরালোভাবে দাবি করেন যে, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় এসেছে এবং এই বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান অবশেষে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটাতে পারে।
এক পর্যায়ে ইসরায়েলিরা ট্রাম্পকে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখায়, যেখানে এমন সম্ভাব্য নতুন নেতাদের একটি মন্টেজ ছিল যারা ইরানের কট্টরপন্থী সরকারের পতন হলে দেশের দায়িত্ব নিতে পারেন। যাদের দেখানো হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন রেজা পাহলভী।
নেতানিয়াহু এবং তার দল এমন কিছু রূপরেখা দেন, যেগুলোকে তাদের মতে প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিত বহন করে। তারা দাবি করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে। তারা আরো দাবি করে দেশটির শাসনব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে, তারা হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে না এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থের ওপর ইরানের আঘাত হানার সম্ভাবনাও নগণ্য হবে।
এছাড়াও মোসাদের গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থার প্ররোচনায় দাঙ্গা ও বিদ্রোহ উস্কে দেওয়া যাবে, যা থেকে ইরানের অভ্যন্তরে রাস্তায় বিক্ষোভ আবার শুরু হবে এবং একটি তীব্র বোমা হামলা ইরানি বিরোধী দলকে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ইসরায়েলিরা এই সম্ভাবনাও উত্থাপন করেছিল যে, ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা ইরাক থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে উত্তর-পশ্চিমে একটি স্থলযুদ্ধ শুরু করতে পারে, যা শাসকগোষ্ঠীর বাহিনীকে আরও বিভক্ত করে এর পতনকে ত্বরান্বিত করবে।
নেতানিয়াহু আত্মবিশ্বাসী ও একঘেয়ে সুরে তাঁর প্রেজেন্টেশনটি পেশ করেন। প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পর রুমেে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে তা বেশ ভালোভাবে গৃহীত হয়। ট্রাম্প বলেন, "আমার কাছে তো ভালোই লাগছে।"
নেতানিয়াহুর কাছে এটি ছিল মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের জন্য সম্ভাব্য সবুজ সংকেত ছিল।
বৈঠক শেষে শুধু নেতানিয়াহুই নন, আরও অনেকেই এই ধারণা নিয়ে বেরিয়েছিলেন যে ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেই ফেলেছেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে, নেতানিয়াহুর সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতার সম্ভাবনায় তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন; ঠিক যেমনটা হয়েছিলেন জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে যখন দুজনের মধ্যে কথা হয়েছিল।
১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস সেই বৈঠকে নেতানিয়াহু আমেরিকানদের দৃষ্টি ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অস্তিত্ব সংকটের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত অন্যরা যখন নেতানিয়াহুকে এই অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন নেতানিয়াহু সেগুলো স্বীকার করলেও একটি মূল বিষয় তুলে ধরেন। তার মতে, পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকির চেয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার ঝুঁকিই বেশি।
তিনি যুক্তি দেন যে, যদি হামলা চালাতে দেরি করা হয় এবং ইরানকে তার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে ও পারমাণবিক কর্মসূচির চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করার জন্য আরও সময় দেওয়া হয়, তবে পদক্ষেপ নেওয়ার মূল্য কেবল বাড়তেই থাকবে।
বৈঠকে উপস্থিত সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণ ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর তৈরি ও সরবরাহ করতে পারে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে এবং অনেক দ্রুততার সাথে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে।
নেতানিয়াহুর প্রেজেন্টেশন এবং ট্রাম্পের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য একটি জরুরি কাজ তৈরি করেছিল। ইসরায়েলি দলটি ট্রাম্পকে যা বলেছিল, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা রাতারাতি কাজ শুরু করেন।
.
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ফলাফল পরের দিন ১২ই ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে শুধুমাত্র আমেরিকান কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত আরেকটি বৈঠকে জানানো হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তাদের নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল এবং তারা ইরানের ব্যবস্থা ও এর কুশীলবদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতেন।
তারা নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাটিকে চারটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। প্রথমত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা, দ্বিতীয়ত শক্তি প্রদর্শন এবং প্রতিবেশীদের হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেওয়া, তৃতীয়ত ইরানের অভ্যন্তরে একটি গণঅভ্যুত্থান এবং চতুর্থতশাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যেখানে দেশ শাসনের জন্য একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেতাকে অধিষ্ঠিত করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, প্রথম দুটি উদ্দেশ্য মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জনযোগ্য। তারা মনে করেন, নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের তৃতীয় ও চতুর্থ অংশ, যার মধ্যে কুর্দিদের দ্বারা ইরানে স্থল আক্রমণের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, এটি একেবারে বাস্তবতাবিবর্জিত।
যখন ট্রাম্প বৈঠকে যোগ দেন র্যাটক্লিফ তাকে গোয়েন্দাদের মূল্যায়নটি সম্পর্কে অবহিত করেন।
সিআইএ পরিচালক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর শাসন পরিবর্তনের দৃশ্যকল্পগুলোকে বর্ণনা করতে একটি শব্দ ব্যবহার করেন, “হাস্যকর।”
সেই মুহূর্তে মার্কো রুবিও তার কথা কেড়ে নিয়ে বলেন “অন্য কথায়, এটা বাজে কথা।”
র্যাটক্লিফ আরও বলেন যে, যেকোনো সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহের অনিশ্চয়তার কারণে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু এটিকে একটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আজারবাইজান থেকে সদ্য ফেরা জেডি ভ্যান্সসহ আরও বেশ কয়েকজন এই আলোচনায় যোগ দেন, তিনিও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন।
এরপর ট্রাম্প জেনারেল কেইনের দিকে ফিরলেন। “জেনারেল, আপনি কী ভাবছেন?”
জেনারেল কেইন উত্তর দিলেন: “স্যার, আমার অভিজ্ঞতা বলে রাখি, ইসরায়েলিদের জন্য এটাই সাধারণ কার্যপ্রণালী। তারা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে, এবং তাদের পরিকল্পনাগুলো সবসময় সুগঠিত হয় না। তারা জানে যে আমাদের তাদের প্রয়োজন, আর সে কারণেই তারা জোর দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে।”
ট্রাম্প দ্রুত মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নটি বিবেচনা করলেন। তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে “তাদের সমস্যা।”
এখানে তিনি ইসরায়েলিদের কথা বলছিলেন, নাকি ইরানি জনগণের কথা, তা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু মূল কথা হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর উপস্থাপনার ৩ ও ৪ নম্বর পর্ব অর্জনযোগ্য কি না, তার ওপর নির্ভর করবে না।
ট্রাম্প প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব সম্পন্ন করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন বলে মনে হচ্ছিল অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা এবং ইরানের সামরিক বাহিনীকে ভেঙে দেওয়া।
পরিকল্পনার সাথে যুক্ত উপদেষ্টাদের ছোট দলটি পরবর্তী দিনগুলোতে যখন আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন জেনারেল কেইন ট্রাম্প ও অন্যদের কাছে একটি উদ্বেগজনক সামরিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের অভিযান মার্কিন অস্ত্রের মজুদ মারাত্মকভাবে হ্রাস করবে, যার মধ্যে মিসাইল ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে, যেগুলো ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে বছরের পর বছর ধরে সরবরাহ করার কারণে এমনিতেই মজুত কমতির মধ্যে ছিল। জেনারেল কেইন এই মজুদ দ্রুত পূরণ করার কোনো স্পষ্ট পথ দেখতে পাননি।
তিনি হরমুজ প্রণালী সুরক্ষিত করার বিপুল অসুবিধা এবং ইরানের তা অবরোধ করার ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন। ট্রাম্প এই সম্ভাবনাটি এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে নাকচ করে দিয়েছিলেন যে, পরিস্থিতি অতদূর গড়ানোর আগেই ইরানের শাসকগোষ্ঠী আত্মসমর্পণ করবে।
ট্রাম্পের ধারণা ছিল যে, এটি খুবই অল্পদিনের একটি যুদ্ধ হবে। জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বোমাবর্ষণের প্রতি দুর্বল প্রতিক্রিয়ার কারণে এই ধারণাটি আরও দৃঢ় হয়েছিল।
যুদ্ধের প্রাক্কালে জেনারেল কেইনের ভূমিকা সামরিক পরামর্শক এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যকার একটি চিরায়ত টানাপোড়েনকে তুলে ধরেছিল। চেয়ারম্যান কোনো পক্ষ না নেওয়ার ব্যাপারে এতটাই অনড় ছিলেন যে, বারবার বলছিলেন যে প্রেসিডেন্টকে কী করতে হবে তা বলা তার কাজ নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরিণতিসহ বিভিন্ন বিকল্প উপস্থাপন করাই তাঁর দায়িত্ব।
বৈঠকে ট্রাম্প অনবরত জিজ্ঞেস করতেন, “তারপর কী?” কিন্তু ট্রাম্প কেবল তাই শুনতেন , যা তিনি শুনতে চাইতেন।
জেনারেল কেইন তার পূর্ববর্তী চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ. মিলির থেকে প্রায় সব দিক দিয়েই ভিন্ন ছিলেন। মিলি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় তীব্র বিতর্কে জড়িয়েছিলেন এবং প্রেসিডেন্টকে বিপজ্জনক বা বেপরোয়া পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখাই তাঁর ভূমিকা বলে মনে করতেন।
আলোচনা চলাকালীন কোনো পর্যায়েই জেনারেল কেইন সরাসরি প্রেসিডেন্টকে বলেননি যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ একটি ভয়াবহ পরিকল্পনা, যদিও তার কিছু সহকর্মী বিশ্বাস করতেন যে তিনি ঠিক এটাই ভাবতেন।
.
ট্রাম্পের উপদেষ্টার কাছে নেতানিয়াহু অবিশ্বস্ত হলেও, পরিস্থিতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের মতামতের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল, যা ট্রাম্পের দলের বা বৃহত্তর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের বিরোধীরা স্বীকার করতে চাইতেন না।
ট্রাম্প তার দুই মেয়াদের শাসনামলে যতগুলো পররাষ্ট্রনীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার মধ্যে ইরান ছিল স্বতন্ত্র। তিনি এটিকে এক অনন্য বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করতেন এবং দেশটির যুদ্ধ করার বা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে বড় ধরনের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিলেন।
অধিকন্তু নেতানিয়াহুর প্রস্তাবটি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিককে ভেঙে ফেলার ব্যাপারে ট্রাম্পের ইচ্ছার সাথে পুরোপুরি মিলে গিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক রিপাবলিক যখন ক্ষমতা নেয়, তখন ট্রাম্পের বয়স ছিল ৩২। সেই সময় থেকেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক কাঁটা হয়ে ছিল।
এখন ৪৭ বছর আগে ধর্মীয় নেতৃত্ব ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প প্রথম রাষ্ট্রপতি হতে পারেন যিনি ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারবেন, এরকম একটি ধারণা তার সামনে উপস্থাপন করা হয়।
তবে নেপথ্যে সবসময় আরো একটি বড় কারণ ছিল। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল কাসিম সুলেইমানির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল।
এছাড়া দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর ট্রাম্পের আস্থা আরও বেড়ে গিয়েছিল। ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তার আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করার জন্য চালানো চোখ ধাঁধানো কমান্ডো অভিযানটি তাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। এই অভিযানে কোনো আমেরিকান প্রাণ হারাননি, যা রাষ্ট্রপতির কাছে মার্কিন বাহিনীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাক্রমের আরও একটি প্রমাণ ছিল।
.
মন্ত্রিসভার মধ্যে হেগসেথই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন।
মার্কো রুবিও সহকর্মীদের কাছে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি এ বিষয়ে অনেক বেশি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন না যে ইরানীরা আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে রাজি হবে, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার পরিবর্তে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের অভিযান চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর পছন্দ।
তবে রুবিও ট্রাম্পকে এই অভিযান থেকে বিরত করার চেষ্টা করেননি এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চেয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন আর কেউ ছিলেন না কিন্তু তিনি ঠেকানোর জন্য বেশি চেষ্টাও করেননি।
ভ্যান্স সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ইরানের সাথে যুদ্ধকে সম্পদের এক বিরাট অপচয় এবং “অত্যন্ত ব্যয়বহুল” বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে তিনি সর্বক্ষেত্রে শান্তিবাদী ছিলেন না। জানুয়ারিতে, যখন ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে বিক্ষোভকারী হত্যা বন্ধ করতে সতর্ক করেছিলেন এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তখন ভ্যান্স ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টকে তাঁর চূড়ান্ত সীমা কার্যকর করতে উৎসাহিত করেছিলেন।
কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট যা চেয়েছিলেন তা ছিল একটি সীমিত, শাস্তিমূলক হামলা, যা ছিল ২০১৭ সালে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জেরে সিরিয়ার ওপর ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আদলে।
ভ্যান্স মনে করতেন ইরানের সঙ্গে শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ একটি বিপর্যয় হবে। তাঁর পছন্দ ছিল কোনো হামলা না করা। কিন্তু ট্রাম্প কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেন জেনে, তিনি আরও সীমিত পদক্ষেপের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছিলেন।
পরে যখন এটা নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল যে রাষ্ট্রপতি একটি বড় আকারের অভিযানে নামতে বদ্ধপরিকর, তখন ভ্যান্স যুক্তি দেন যে, দ্রুত উদ্দেশ্য অর্জনের আশায় বিপুল শক্তি প্রয়োগ করা উচিত।
সহকর্মীদের সামনে ভ্যান্স ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা এবং অগণিত প্রাণহানির কারণ হতে পারে। এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটকেও ভেঙে দিতে পারে এবং নতুন কোনো যুদ্ধ না হওয়ার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী বহু ভোটারের কাছে এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভ্যান্স আরও কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আমেরিকার অস্ত্রশস্ত্র সমস্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন একটি শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আগামী কয়েক বছরের জন্য সংঘাত মোকাবেলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি খারাপ অবস্থানে ফেলে দিতে পারে।
ভ্যান্স তাঁর সহযোগীদের বলেছিলেন যে, যখন শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে, তখন প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কী করবে, তা কোনো সামরিক অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়। একটি যুদ্ধ সহজেই অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় নিতে পারে। অধিকন্তু, তিনি মনে করেন যে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে একটি শান্তিপূর্ণ ইরান গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খুব কম।
আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি ছিল হরমুজ প্রণালীর ক্ষেত্রে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী এই সংকীর্ণ জলপথটি যদি রুদ্ধ হয়ে যেত, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর অভ্যন্তরীণ পরিণতি মারাত্মক হতো, যার শুরুটা হতো পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে।
ডানপন্থীদের মধ্যে হস্তক্ষেপের আরেকজন টাকার কার্লসন, গত এক বছরে বেশ কয়েকবার ওভাল অফিসে এসে জনাব ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে ইরানের সাথে যুদ্ধ তার রাষ্ট্রপতি পদকে ধ্বংস করে দেবে।
কার্লসনকে বহু বছর ধরে চিনতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প ফোনে কার্লসনকে বলেন, “আমি জানি আপনি এটা নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।” জবাবে কার্লসন জিজ্ঞাসা করলেন তিনি কীভাবে জানেন। ট্রাম্প উত্তর দেন “কারণ সবসময়ই তাই হয়।”
.
ফেব্রুয়ারির শেষ দিনগুলোতে আমেরিকান ও ইসরায়েলিরা একটি নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করছিল, যা তাদের সময়সূচীকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করবে। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দিনের আলোতে, খোলা আকাশের নিচে, বিমান হামলার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত অবস্থায় শাসকগোষ্ঠীর অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন। এটি ছিল ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রস্থলে আঘাত হানার এক ক্ষণস্থায়ী সুযোগ, এমন এক লক্ষ্যবস্তু যা হয়তো আর কখনো আসবে না।
ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ রুদ্ধ করার জন্য একটি চুক্তিতে আসার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন, এর জন্য কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। এই আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য অতিরিক্ত সময়ও দিয়েছে।
মূলত ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ আগেই মনস্থির করে ফেলেছিলেন বলে তাঁর বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন। কিন্তু ঠিক কখন তা করবেন, সে বিষয়ে তিনি তখনও সিদ্ধান্ত নেননি। নেতানিয়াহু তাঁকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেন।
সেই একই সপ্তাহে, ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে সর্বশেষ আলোচনার পর কুশনার এবং উইটকফ জেনেভা থেকে ফোন করেন। ওমান এবং সুইজারল্যান্ডে তিন দফা আলোচনার মাধ্যমে তারা দুজন একটি চুক্তিতে আসতে ইরানের সদিচ্ছা যাচাই করেছিলেন।
এক পর্যায়ে তারা ইরানিদেরকে তাদের কর্মসূচির পুরো সময়কালের জন্য বিনামূল্যে পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং এটি ছিল একটি পরীক্ষা যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর তেহরানের এই জেদ আসলেই বেসামরিক জ্বালানির জন্য, নাকি বোমা তৈরির সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য।
ইরানিরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে একে তাদের মর্যাদার ওপর আঘাত বলে আখ্যা দিয়েছে। তখন কুশনার এবং উইটকফ রাষ্ট্রপতির কাছে পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
তাঁরা বলেন, তাঁরা সম্ভবত কোনো একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন, কিন্তু তাতে কয়েক মাস সময় লাগবে। কুশনার তাঁকে বলেন, ট্রাম্প যদি জানতে চান যে তাঁরা তাঁর চোখে চোখ রেখে বলতে পারবেন কি না যে তাঁরা সমস্যাটির সমাধান করতে পারবেন, তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক দূর যেতে হবে, কারণ ইরানীরা ছলচাতুরী করছে।
বৃহস্পতিবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, বিকেল প্রায় ৫টার দিকে সিচুয়েশন রুমে একটি চূড়ান্ত বৈঠক শুরু হয়। ততক্ষণে কক্ষে উপস্থিত সকলের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পূর্ববর্তী বৈঠকগুলোতে সবকিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছিল; প্রত্যেকেই একে অপরের অবস্থান জানত। আলোচনাটি প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে।
ট্রাম্প টেবিল যথারীতি তাঁর আসনে বসেছিলেন। তাঁর ডানদিকে বসেছিলেন জেডি-ভ্যান্স; ভ্যান্সের পাশে ছিলেন মিস ওয়াইলস, তারপর র্যাটক্লিফ, তারপর হোয়াইট হাউসের পরামর্শক ডেভিড ওয়ারিংটন, এবং তারপর হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং। চেউং-এর বিপরীতে ছিলেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট; তাঁর ডানদিকে ছিলেন জেনারেল কেইন, তারপর হেগসেথ এবং রুবিও।
যুদ্ধ-পরিকল্পনার এই টিম এতটাই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল যে, বিশ্ব তেল বাজারের ইতিহাসে বৃহত্তম সরবরাহ সংকট মোকাবেলার দায়িত্বে থাকা দুজন মূল কর্মকর্তা অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল।
হেগসেথ এবং কেইন হামলা পরিকল্পনার ঘটনাক্রম তুলে ধরেন। এরপর ট্রাম্প বলেন যে তিনি একে একে সবার মতামত শুনতে চান।
ভ্যান্স, যিনি পুরো ধারণাটির সঙ্গেই সুস্পষ্টভাবে দ্বিমত পোষণ করছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে বললেন: আপনি জানেন আমি মনে করি এটি একটি খারাপ পরিকল্পনা, কিন্তু আপনি যদি এটা করতে চান, আমি আপনাকে সমর্থন করব।
মিস ওয়াইলস মিস্টার ট্রাম্পকে বলেন যে, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যদি তিনি মনে করেন যে তাঁর এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, তাহলে তাঁর তা করা উচিত।
র্যাটক্লিফ অগ্রসর হওয়া উচিত কিনা সে বিষয়ে কোনো মতামত দেননি, তবে তিনি তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কম্পাউন্ডে ইরানি নেতৃত্বের বৈঠকের চাঞ্চল্যকর নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন।
সিআইএ পরিচালক রাষ্ট্রপতিকে বলেন যে, “যদি আমরা শুধু সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা বোঝাই, তাহলে সম্ভবত আমরা তা করতে পারব।”
জিজ্ঞাসা করা হলে, হোয়াইট হাউসের আইনজীবী ওয়ারিংটন বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যেভাবে পরিকল্পনাটি তৈরি করে রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করেছেন, সেই নিরিখে এটি একটি আইনত অনুমোদিত বিকল্প পথ।
তিনি কোনো ব্যক্তিগত মতামত দেননি, কিন্তু রাষ্ট্রপতি মতামত দেওয়ার জন্য চাপ দিলে তিনি বলেন যে, একজন মেরিন সেনা হিসেবে তিনি বহু বছর আগে ইরানের হাতে নিহত এক মার্কিন সেনাসদস্যকে চিনতেন। এই বিষয়টি অত্যন্ত ব্যক্তিগতই ছিল। তিনি রাষ্ট্রপতিকে বলেন যে, ইসরায়েল যদি তা সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রেরও তাই করা উচিত।
চেউং সম্ভাব্য জনসংযোগগত প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। ট্রাম্প যুদ্ধের বিরোধিতা করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। জনগণ বিদেশে সংঘাতের জন্য তাকে ভোট দেয়নি।
এই পরিকল্পনাগুলো জুনে ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলার পর প্রশাসন যা বলেছিল, তারও সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে বলে আট মাস ধরে যে দাবি করা হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা তারা কীভাবে দেবে? চেউং তখন হ্যাঁ বা না কোনটাই বলেননি, তবে তিনি বলেন যে, ট্রাম্প যে সিদ্ধান্তই নেবেন, সেটিই সঠিক হবে।
মিস লেভিট রাষ্ট্রপতিকে জানান যে এটি তাঁর সিদ্ধান্ত এবং সংবাদকর্মী দলকে তিনি যথাসাধ্য বিষয়টি সামাল দেবেন।
হেগসেথ জানান, শেষ পর্যন্ত তো তাদের ইরানিদের মোকাবিলা করতেই হবে, তাই এখনই তা করে ফেলা ভালো। তিনি প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন পেশ করেন। তিনি জানান, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সৈন্য দিয়ে তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযানটি চালাতে পারবে।
জেনারেল কেইন সংযতভাবে ঝুঁকিগুলো এবং এই অভিযানটি অস্ত্রশস্ত্র হ্রাসের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে তা তুলে ধরেন। তিনি কোনো মতামত দেননি। তার অবস্থান ছিল যে, যদি ট্রাম্প এই অভিযানের নির্দেশ দেন, তবে সামরিক বাহিনী তা কার্যকর করবে।
রাষ্ট্রপতির শীর্ষ দুই সামরিক নেতাই এই অভিযানটি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করার মার্কিন ক্ষমতা সম্পর্কে একটি পূর্বরূপ তুলে ধরেন।
যখন তাঁর কথা বলার পালা এলো, তখন রুবিও আরও স্পষ্ট করে রাষ্ট্রপতিকে বলেন, যদি আমাদের লক্ষ্য হয় শাসন পরিবর্তন বা অভ্যুত্থান, তবে আমাদের তা করা উচিত নয়। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, তবে সেই লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারি।
সকলেই রাষ্ট্রপতির সহজাত প্রবৃত্তিকে মেনে নিয়েছিল। তারা তাঁকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে, অকল্পনীয় ঝুঁকি নিতে এবং কোনো না কোনোভাবে সফল হতে দেখেছে। এখন আর কেউ তাঁকে বাধা দেবে না।
সবার কথা শুনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, “আমার মনে হয় আমাদের এটা করা দরকার।"
তিনি বলেন, তাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে এবং ইরান যেন শুধু ইসরায়েলের দিকে বা সমগ্র অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে না পারে।
জেনারেল কেইন জনাব ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে তাঁর হাতে কিছুটা সময় আছে; পরের দিন বিকেল ৪টার আগে অনুমোদন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
পরদিন বিকেলে এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা অবস্থায়, জেনারেল কেইনের দেওয়া সময়সীমার ২২ মিনিট আগে ট্রাম্প নিম্নলিখিত আদেশটি পাঠান:
“অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদিত। কোনো বাতিলকরণ চলবে না। শুভকামনা।”