জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই রসালো আম নামানোর উৎসবকে কেন্দ্র করে আবারো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে উত্তরের জনপদ রাজশাহী অঞ্চল। গাছভর্তি কাঁচা-পাকা আম, মোকামে শ্রমিকদের ব্যস্ততা, ট্রাকভর্তি চালান আর হাটবাজারের উৎসবমুখর পরিবেশে যেন উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন বার্তা দিচ্ছে। একসময় শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে পরিচিত আম এখন রাজশাহী, চাঁপнимаবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
कृषि সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (রাজশাহী অঞ্চলে আমের মৌসুম ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে
রাজশাহী অঞ্চল) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এই চার জেলায় (রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ) মোট ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। যেখানে গাছের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। এবার এসব বাগান থেকে প্রায় ১১ লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক লেনদেন প্রায় ১১ হাজার ১৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশের মোট আম উৎপাদনের সিংহভাগই আসে রাজশাহী অঞ্চলের এই চার জেলা থেকে। গত দুই দশকে যেমন বেড়েছে বাগানের পরিমাণ, তেমনি বেড়েছে এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও। উন্নত জাতের চাষ, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা ও অনুকূল আবহাওয়া আম উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ জেলায় ৩৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৫৮ হাজার টনের বেশি। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার ফজলি, খিরসাপাত ও ল্যাংড়া আমের স্বাদ ও গুণগতমান দেশের অন্য জেলার তুলনায় আলাদা। শতবর্ষী ফজলি বাগানের ঐতিহ্যও রয়েছে এ জেলায়।
নওগাঁয় এবার ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে, প্রায় তিন লাখ ৮৭ হাজার টন আম উৎপাদন হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শুধু নওগাঁ জেলাতেই প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হতে পারে। গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানি হলেও এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রপ্তানিযোগ্য ও রাসায়নিকমুক্ত আম উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুসরণেও জোর দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী জেলায় এ বছর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবার প্রায় ৭৮০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হতে পারে। ইতোমধ্যে ১৫ মে থেকে দেশি গুটি আম বাজারে ওঠার মাধ্যমে রাজশাহীতে অফিশিয়ালি আমের মৌসুম শুরু হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে গোপালভোগ, খিরসাপাত (হিমসাগর), ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি ও আশ্বিনা বাজারে আসবে। জেলার বাঘা উপজেলাতেই প্রায় আট হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে।
নাটোরেও আম অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এ বছর পাঁচ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার টন। কৃষি বিভাগ আশা করছে, এবার জেলার আম-বাণিজ্য ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
আমকে ঘিরে এখন উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ। কৃষিবিদদের মতে, গাছ থেকে আম নামানো, বাছাই, প্যাকেজিং, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও চালান কার্যক্রমে লক্ষাধিক মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়। শ্রমিক, ট্রাকচালক, ভ্যানচালক, ঝুড়ির কারিগর, কুরিয়ার সার্ভিস, ব্যাংক, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ নানা খাতে অর্থনৈতিক গতি তৈরি হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, রাজশাহীর বানেশ্বর, বাঘা, আড়ানী ও চারঘাট, নাটোরের লালপুর এবং নওগাঁর সাপাহার এখন দেশের অন্যতম বড় আম-বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু সাপাহার থেকেই প্রতিদিন তিন শতাধিক ট্রাকে আম চালান হচ্ছে।
রাজশাহীর বানেশ্বরের এক ব্যবসায়ী বলেন, "আম আমাদের কাঁচা টাকা। এই কয়েক মাসের আয় দিয়েই অনেকের সারা বছরের সংসার চলে।" পবা উপজেলার আমচাষি মনিরুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরুতে কিছু আম ঝরে গেলেও এখন ফলন ভালো আছে। দাম ভালো পেলে লাভ হবে।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আম এখন আর শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের বড় বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য। রপ্তানি ও আমভিত্তিক কৃষিশিল্প গড়ে তোলা গেলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। তবে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশে আম পাঠাতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী উৎপাদন, সংগ্রহ ও প্যাকেজিং করতে হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’ এ বিষয়ে চাষিদের সহায়তা করছে।
পরিকল্পিতভাবে আমভিত্তিক হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে সারা বছরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েক মাসের এই আমকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য বদলে দিচ্ছে হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কালবৈশাখী না হলে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে আরো চাঙা হবে আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি।